https://banglagolpokobita.com/wp-content/uploads/2018/07/প্রতিশোধ.jpg

সুধাংশুর বাবা অমলকান্তি রায় নেহাৎ গরীব ঘরের ছেলে। নুন আনতে যে পান্তা ফুরোয় এই অবস্থাতেও ছিলেন না কারন পান্তাই যোগার হতো না আবার নুন! ভাগ্যের অন্বেষণে শহরে এসে লটারির টিকেট কাটেন। তার প্রতি ভাগ্যদেবী যেন সুপ্রসন্ন ছিলেন। প্রথম পুরষ্কার টাই জিতে যান। তারপর অগ্রগতিটা ধারাবাহিক ভাবেই হচ্ছিলো। সেই টাকা শেয়ার মার্কেটে খাটিয়ে বহুগুণ লাভ করেছেন। তারপর বিভিন্ন জায়গায় ব্যাবসা ফেঁদে একসময় আঙ্গুল ফুলে বটগাছ হয়ে গিয়েছেন। জীবনের প্রায় শেষ বয়সে তিনি বিয়ে করেন এক পরমা সুন্দরী মেয়েকে। খুব বড় ঘরের মেয়ে। মেয়ের অভ্যেস, প্রতি মাসের কোন না কোনদিন বাইরের দেশ থেকে তাকে ঘুরে আসতে হবেই। বিশেষ করে সেটা যদি আফ্রিকান জঙ্গল হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই। অতি ভ্রমণপিপাসু অমলকান্তির বউ। তার স্ত্রী খুব পতিপরায়ণাও ছিলেন। আজও স্ত্রীর কথা একান্তে মনে হলে তিনি নিরবে দু’ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন করেন। বিয়ের দু বছরের মাথায় অরুণা দেবী মানে অমলকান্তির স্ত্রী মারা যান। অরুণা দেবীর মৃতদেহে অদ্ভুত রকমের আঁচড়ের দাগ পাওয়া যায়। জানা যায় নি, তিনি কোন কারনে মারা গেছেন। ময়নাতদন্তে এসেছে অতিরিক্ত মানসিক সমস্যা! তবে অরুণা দেবী একটা চিঠিতে মৃত্যুর আগে বলে গেছেন,  মৃত্যুর পর তার ঘরটা যেন তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। অমলকান্তি তাঁর স্ত্রীর কথা রেখেছেন, অরুণা দেবীর ঘর আজো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।

রাত্র ৯ টা। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম আলোটা মিটিমিটি জ্বলছে। 
অন্ধকারের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, অভিজাত এক বাড়ির পাইপের গাত্র বেঁয়ে একটা ছায়ামূর্তি নেমে যাচ্ছে। টি-শার্ট আর থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট পরহিত। প্যান্টের বেশিরভাগ জায়গাতেই ছেঁড়া ছেঁড়া। হাতে কিছু রিস্ট ব্যান্ড,গলায় চার-পাঁচটে লকেট। চুলগুলো অগোছালো। গলায় ঝুলছে দামি সানগ্লাস। ছায়ামূর্তিটা দেওয়াল টপকে সামনের বড় রাস্তায় নেমে পড়লো। চারদিকে অন্ধকারের ঘন কালো কুয়াশা। ছায়ামূর্তিটা একসময় হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারের কুয়াশায় মিলিয়ে গেল।

সুধাংশু এবার আঠারো তে পা দিল। মাধ্যমিক শেষ হয়েছে। বেসরকারি থেকে টেনে-টুনে পাস করে এসেছে। তবে, এই
বয়সে মদ জুয়া সবকিছুই তার নখদর্পনে। অমলকান্তি আজ পর্যন্ত মদ-সিগারেট দূরের কথা, নেশা হয়ে যাবে বলে এক কাপ চা পর্যন্ত খাননা, আর তার সন্তানের এই বেহাল অবস্থা। মনে মনে একটা ক্ষোভ পুষে রেখেছেন অমলকান্তি। তিনি সুধাংশুকে বারকয়েক মাদক পূর্ননির্বাসন কেন্দ্রে, পাঠিয়েছিলো। লাভ হয়নি, এ যেন লঘু থেকে লঘুতর নেশা। এই নেশা কি আর এত সহজে যায় ?

অমলকান্তি সারাদিন খাটা-খাটুনি শেষে অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন।ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত তার দেহ। যেহেতু বর্তমানে তিন একজন উচ্চ মর্যাদার ব্যাক্তি তাই তার আবাসস্থানটাও উন্নত মানের। শহরের সবচেয়ে উন্নত আবাসিক এলাকা। কড়া নিয়ম-কানুন চলে এখানে। সবচেয়ে বড় কথা, অমলকান্তি স্বয়ং যেহেতু এই আবাসিক সোসাইটির চেয়ারম্যান তাই তার দায়িত্বটাও বেশি। মিটিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। বেশিরভাগ সময়ই তিনি খুব ক্লান্ত থাকেন।
বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিলেই  বোধহয় ঘুমরাজ্যে ডুব দিবেন। বাসায় এসে তবুও তিনি সুধাংশুর খোঁজ করলেন। ছেলেটাকে তিনি সব দিয়েছেন। দিতে পারেননি শুধু এতটুকু সময়। যার জন্য ছেলেটা আজ এমন ছন্নছাড়া। ছেলেটা আজও বাসায় নেই। সুধাংশুর একটা জিনিষ খুবই অদ্ভুত বৈকি ! বাবা যখন বাড়ি ফিরবেন তার একটু আগেই ঘর ছাঁড়তে হবে। বিকেল কিংবা সকালে এক-আধটুকু কি দোষ হয় কে জানে ? বাবার উপর নিজের জেদটুকু চাপিয়ে দিতেই, সুধাংশু হয়তো এই বেনিয়ম করে বাইরে বেরিয়ে যায়। সোসাইটিতে এ নিয়ে অনেক কানা-ঘুসা চলছে। অনেকে আবার অমলকান্তিকে দ্বিতীয় বিয়ে করার পরামর্শও দিয়েছেন; কিন্তু অমল বাবু সোজাসাপটা সবাইকে মানা করে দিয়েছেন।

রাতা দেড়টা। অমলবাবু এখনও জেগে আছেন। তিনি আজ সুধাংশুর বেনিয়মের বিহিত করেই ক্ষ্যান্ত হবেন। ঘড়ির দিকে একটু পরপর তাঁকাচ্ছেন আর আনমনে পায়চারী করছেন। সুধাংশু আজো নেশা করে বাড়ি ফিরে এসেছে। সোসাইটির দাড়োয়ান ঢুকতে দিতে চায়নি। একসময় গালাগাল আর ধস্তাধস্তি করেই সেই ব্যাপার থেকে খালাস পেয়েছে। দাড়োয়ান আবার ব্যাপারটা সাথে সাথেই অমল বাবুকে মেসেজ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ইদানিং সুধাংশুর কাছে তার জীবন অভিশপ্ত বলে মনে হয়। সুধাংশ দরজার দোরগোড়াতে দাঁড়াতে অমলকান্তি বোটকা একটা গন্ধ বাতাসে টের পেলেন। ছেলেটাকে মারতে গিয়েও মারলেন না। শুধু এতটুকু বললেন, 
“তোমার মা যদি এখন বেঁচে থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তোমার জন্য আজ আত্মাহুতি দিতেন !”

অনেক দিন পর কেন যেন মায়ের কথা খুব
মনে পরলো, সুধাংশুর। সিঁড়ি বেঁয়ে টলতে টলতে উপরের ঘরে উঠে গেল। আজ মাকে
দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। সুধাংশুর চরিত্র যতই খারাপ হোক, মাতৃভক্তিটা মাঝে মাঝে সাড়া দিয়ে উঠে। তবে সেটা ক্ষণিকের জন্যই! জন্মের পর হতে মায়ের আদর কেমন হয়, সেটা জানে না সুধাংশু। অমলবাবুই তার বাবা, তার মা। অমল বাবু একটু তেঁতুলের শরবত করে সুধাংশুকে খাইয়ে দিলেন নেশার তীব্রভাবটা কেঁটে যাওয়ার জন্য। সুধাংশুকে বিছানায় আধশোয়া করে বসিয়ে জুতো-মোজা খুলে ধীরে ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। এদিকে, অমল বাবু দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করতে করতে নিজের রূমে চলে গেলেন। সুধাংশু কিছুক্ষণ নিভৃতে শুয়ে থাকলো। আজ তার ঘুম আসছেনা। তার অশ্রুসজল নয়ন থেকে টপ টপ করে অশ্রু বিসর্জনের ফলে, অশ্রু হতে সৃষ্ট ঝর্ণাধারা ক্রমেই তার বিছানার চাদর প্লাবিত করছিলো।

রাত প্রায় আড়াইটা-তিনটে। এখন বাসার সবাই ঘুম সাগরে নিমগ্ন। কুম্ভ-কর্ণের মত নাক ডাকার শব্দ তার প্রমাণ করছে। সুধাংশু ভেবেছে, সে আজ তার মার রুমে অবশ্যই ঢুকবে। চুপিসারে সে বাবার ডেস্ক থেকে মার রুমের চাবিটা বের করলো । ময়লা পড়ে যাওয়া রুক্ষ চাবির তোড়া। দশ-পনেরোটা চাবি একসাথে করে রাখা। একটা চাবি পিতল বর্ণ। চাবির রংটা দেখে সুধাংশু যতটা না আশ্চর্য হলো তার চেয়ে বেশি চাবির হল উপরে কারুকাজ দেখে। অসম্ভব সুন্দর করে কারুকাজ করা। খুব নিখুঁত করে আঁকা ছবিটা। খুব পছন্দ হল সুধাংশুর। বারান্দা পেড়িয়ে মায়ের রূমের সামনে চলে আসলো। এদিকে, কাজের লোকেরাও আসেনা তাই এদিকটা ঠিকমত পরিষ্কারও করা হয়না। সুধাংশু কিছুক্ষণ মায়ের দরজা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো। ধূলোর ময়লা আর মাকড়সার জালে সুধাংশুর দেহাকৃতি দরজায় জলছাপের মত ছেপে গেল। সুধাংশু কিছুক্ষণ মায়ের উপর অভিমানস্বরূপ নিজের বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করতে লাগলো।

দ্রুতবেগে একটা ছায়ামূর্তি সুধাংশুর পাশ কেটে  চলে গেল। স্বভাবসুলভভাবে সুধাংশু নিজেকে সামলে চিৎকার ছেড়ে বলে উঠলো, ‘ওখানে কে ?’
অন্ধকার নিরব রাত্তিরে কোথাও থেকে কোন উত্তর এলোনা। বাতাসের শুধু শোঁ শোঁ শব্দই শোনা গেল। সুধাংশু হাতের পিতল বর্ণের চাবিটা দিয়ে কিছুক্ষণ দরজা খোলার চেষ্টা করলো। দরজার চাবি মিল না হওয়ায় দরজাটা তখনো খোলা সম্ভব হলোনা। অন্য চাবিগুলো দ্বারা চেষ্টা করেও সুধাংশু কোনমতেই দরজাটা খুলতে পারলোনা। ব্যর্থ হয়ে সুধাংশু দরজার নিচে বসে তালাটার কিছুক্ষণ ঘৃণার দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকলো। সুধাংশুর জীবনটাই ব্যর্থতায় ভরা। নিজের উপরও কিছুটা ঘৃণার জন্ম নিল। সুধাংশু আবার চামচ দিয়ে দরজা খোলায় খুব দক্ষ ছিলো। ছোটবেলায় মা মারা যাবার পর বাবা প্রায়সময়ই ঘরের দরজা বন্ধ করে অফিসে চলে যেতেন। সুধাংশু সেই সময়টাতে নিজের একাকীত্ব থেকে মুক্তি পাবার আশায় চামচ দিয়ে দরজা খোলার ব্যাপারটা খুব ভালোভাবেই রপ্ত করেছে।

অনেক দিনের তালা। তালার ভেতরটাতেও ধূলো পড়ে ঘন আস্তর সৃষ্টি হয়েছে। তালাটার উপরে আবার হাজার রকমের সুতো, পচাঁ ফুল আর ঘটির মত একটা জিনিষ বাঁধা। সুধাংশু এতক্ষণ খেয়াল করেনি, দরজার উপরে দু’টো ত্রিশুলও টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। 
দরজায় আস্তে করে ধাক্কা দিল। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। ভেতরের দিকে তাকাল। রুমটা কেমন যেন ঠান্ডা আর হিমশীতল। সোঁদা গন্ধ। রুমে চোখে পরার মত বা অস্বাভাবিক কিছুই নেই। শুধু,কেমন যেন অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজমান।  জানালাটা খুলে দিল। গোল চাঁদটা যেন মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার
রূপালী আতঙ্ক। আর সেই আতঙ্কেরাও যেন সেই রুমের হিম মৃত্যুশীতল মর্গ নিরবতা বিষাদ তমসার কাছে আজ পরাজিত। সুধাংশু তার মায়ের চেহেরা কখনো দেখেনি। সুধাংশুর জন্মের সময় তিনি ইহলোক ত্যাগ করে নরকবাসী হয়েছেন। সবাই বলে কথাটা। সুধাংশু আজো জানেনা তার জন্মদাত্রী মা কেনো নরকবাসী হবেন!  তার ছবিও বাড়ির কোথাও রাখা হয়নি। “সব ছবি একাট্টা করে এ ঘরে বস্তাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে”- একসময় সুধাংশুর বাবা কথার ছলে সুধাংশুকে বলেছিলেন। সুধাংশু আলমিরা থেকে মায়ের কাপড়গুলোর ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করে। সোদা সোদা পুরোনো কাপড়ের গন্ধ বিনা অন্য কিছুই পাওয়া যায়না।

কাছেই কারো পাঁয়ের শব্দ শোনা যায়। সুধাংশু দরজাটা আস্তে করে চাঁপা দিয়ে, আলমিরার একপাশে গাঁ ঢাকা দিয়ে ফেলে। পাঁয়ের শব্দটা ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যায়। সুধাংশু অসাবধানবশৎ উঠে দাঁড়ানোর সময় উপর থেকে একটা বাক্স ঝনঝন শব্দে মেঝেতে পড়ে যায়। পরক্ষণেই বাতাসের মত শোঁ শোঁ শব্দ করে জোড়ালভাবে বাক্সের ভেতর থেকে কিছু একটা বের হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সুধাংশুর চোখ বাইরের জানালার অবধি চলে যায়। হালকা নীলচে ময়লা পর্দাটা দপদপ করে বাতাসে উড়ছে। সুধাংশু মুহুর্তেই ঘরের ভেতর চাঞ্চল্যকর কিছুর উপস্থিতি অনুভব করে। সুধাংশু বাহিরে যতটাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেনা কেন ভিতরে ভিতরে ঠিকই তার বুকের খাঁচা ছিড়ে হৃদপিন্ডটা বেরিয়ে আসতে চাইছে !

কিছুক্ষণ রুমের ভেতর পিনপতন নীরবতা বিরাজমান। অদূরে একটা কুকুরের ডাকে সুধাংশুর গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো । সুধাংশু তার চোখ খুলতে চাইছেনা। চোখ খুললেই যদি ভয়ঙ্কর কিছু দেখতে হয়। কি অদ্ভুত !

সুধাংশু কালবিলম্ব না করে দরজার নবের দিকে হাত বাড়ালো। জ্যাম হয়ে আছে। কতক্ষণ ঘুরানোর পরও খুললোনা । নিরুপায় হয়ে সুধাংশু হেঁটে হেঁটে পুরো ঘর দেখছে। দেওয়ালে টাঙানো বিভিন্ন কারুকর্ম। ঘরের মাঝখানে নিষ্ক্রিয় ফায়ারপ্লেস। সুধাংশুর কাছে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগলো। এছাড়াও, দেওয়ালে বাহারী রকমের মুখোশ আটকানো রয়েছে। সুধাংশুর কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর লাগলো, এ ঘরে ক্লজিট সংখ্যা অন্য ঘরগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি। মহিলাদের জামা-কাপড় বেশি থাকতে পারে এজন্যই হয়তো ক্লজিট সংখ্যা বেশি। পরক্ষণেই সুধাংশুর পেছনের ক্লজিটটা ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। সুধাংশু কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। কৌতুহূল মানুষকে ভয়ের চূড়ান্ত পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারে কথাটা সত্যিই। সুধাংশু দরজাটা আরেকটু ফাঁক করে উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করলো। চাঁদের আবছা আলোয় ওর দেখতে খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিলোনা। খুব সুন্দর একটা পুতুল। টলটলে মার্বেল বসানো চোখ, তুলতুলে মোলায়েম কাপড়ের তৈরী পুরো শরীর। সুধাংশু পুতুলটা বাইরে আনার চেষ্টা করলো। ক্লজিটের ভেতরটা একদম ঠান্ডা। ডিপ-ফ্রিজের মত। সে হাতটা ক্লজিটের ভেতরে ঢুকানোর সাথে সাথে কিছু একটার আচরণ অনুভব করলো।  গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। সুধাংশু পড়িমড়ি করে দরজার কাছে চলে আসলো। দরজাটা কিছুতেই খুলছেনা। আবছামতন একটা ছোট্ট ছাঁয়া সুধাংশুর সামনে। সুধাংশু নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। চাঁদের আলোয় সে স্পষ্ট দেখছে আবছা ছায়াটা কোন একটা মানুষের অবয়ব। ছায়াটার শরীর বোঝা যাচ্ছে। হাওয়ায় ভর করে বস্তুটা সুধাংশুর দিকে এগিয়ে আসছে। সুধাংশু অস্থির হয়ে পড়ে। রক্তে অ্যাড্রোনালিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুধাংশু একটা সময় জ্ঞানশূণ্য হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।

সকালের কাঁচামিঠা রোদ চোখে মুখে লাগতেই মেঝে থেকে উঠে বসে। দ্রুতহস্তে তালা-চাবি খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।এবার, কোনরকম সমস্যা হয়না। সুধাংশু, সারাদিন কাউকে গতকাল রাতের কথা জানায় না। ওর মন দিন দিন ভারী হতে থাকে। সবসময়ই ভয়ে কুকঁড়ে থাকে। খুব একটা প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বের হয়না। মাঝরাত্রিতে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠে। সুধাংশুর এহেন পরিস্থিতিতে অমলবাবু আবার চিন্তায় পড়ে যান। একজন সাইক্রাইটিস্ট ডেকে পাঠানো হল। তিনি জানালেন, 
অনেকদিন ধরে একা একা থাকার কারণে অজানা ভয় ওর মাঝে ঢুকে গিয়েছে।

অমলবাবুর চেহেরায় অসহায়ত্বের ব্যাপারটা স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে । পুরো জগৎ সংসারে এই ছেলেটা ছাড়া তার আর কোন সঙ্গী নেই। ছেলেটা আজ মৃত্যুপথযাত্রী।  একজন বাবার কাছে নিজের ছেলের মৃত্যু চেঁয়ে দেখার চেয়ে কষ্টকর হতে পারে !

অমলবাবু ছেলেকে নিয়ে যেখানে যেখানে যাওয়া প্রয়োজন সব জায়গায় গেলেন। শহরের নামি-দামি সকল ডাক্তারের শরণাপণ্য হয়েছেন কিন্তু, কোন লাভ হয়নি। অবশেষে অমলবাবু হাল ছেড়ে দিয়ে, নিজেই ঘরে বসে বসে ছেলের রোগের পরিচর্যা করছেন। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন। নিজের দায়িত্বের বোঝা থেকে অনেক কিছুই স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছেন। সুধাংশুকে নিয়েই এখন তার সকাল শুরু হয়,  ওকে দিয়েই তার দিনের সূর্য অস্ত যায়। সুধাংশুর তবুও কোন উন্নতি নেই। উত্তরদিকের রূমটা আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ।

শরৎকাল। আকাশে সাদা সাদা মাঘ। নদীর তীরে কাশবনের মেলা। মাটির সোদা সোদা ভেজা গন্ধ পাওয়ার লোভে অমলবাবু সুধাংশুকে নিয়ে শহর ছেড়ে একটু গ্রামাঞ্চলের দিকে বেরিয়ে পড়লেন। নদীর পাড়ে। মুক্ত বাতাসে। ধারে কাছেই কোথাও গ্রাম্য মেলা হচ্ছে। অমলবাবু দীর্ঘদিন যাবত মেলা দেখেননা। সময় করেই উঠতে পারেননা। সুধাংশু নির্জীব। সুুধাংশুকে নিয়ে অমলবাবু মেলায় চলে আসলেন। বাহারী রকমের জিনিষ মেলায় পাওয়া যাচ্ছে। সুধাংশু চোখ মেলে শুধু দেখেই যাচ্ছে।

“ওইচ বোর্ড। প্ল্যানচেট। একদম কম দামে দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি চলে আসুন !”- একজন বৃদ্ধমতন কুঁজো লোক উচ্চস্বরে চিৎকার করে বিক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

অমলবাবু ওইচ বোর্ডের নাম শুনে কিছুটা থমকে দাঁড়ালেন। এই অদ্ভুত জিনিষটা গ্রাম্য মেলায় এলো কিভাবে ? 
ওইচ বোর্ড সম্পর্কে বর্তমান পৃথিবীর অনেকেরই ধারণা নেই। প্রাচীনকালের গ্রীক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে জাদুর প্রচলন যখন ঘোরতরভাবে চলছিলো ঠিক তখন এই বোর্ডের উপস্থিতি সম্পর্কে জানা যায়। প্ল্যানচ্যাট মূলত ভূত নামানোর খেলা হিসেবে অধিক পরিচিত। ওইচ বোর্ডের মাঝখানে একটা লাল রঙের বোতাম ও অ্যালফাবেট বাটন থাকেন। দুই বা তিন-চারজন মিলে লাল বাটনটা চেপে ধরে থাকতে হয়। ঘরের আলো যথাসম্ভব কমিয়ে রাখতে হয়। মনে মনে বলতে হয়,

“ইফ এ্যানি গুড সোল পাসেস বাই, কাম ইন”

যদি কোন আত্মা ওইচ বোর্ডের আশ-পাশ দিয়ে যায়, তবে লাল বাটনটা সবুজ রঙ ধারণ করে। এতে করে, মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আত্মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে। অমল বাবু কি যেন মনে করে বুড়োর কাছ থেকে  ওইচ বোর্ডটা কিনে নিলেন। সুধাংশু তীব্র অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলো। অমলবাবু  সুধাংশুর এমন কুরুচিপূর্ণ ব্যাবহার কখনোই দেখেননি। একপ্রকার সুধাংশুর মতের বিরুদ্ধেই উইচ বোর্ডটা অমলবাবু কিনে নিলেন। সুধাংশু প্রচন্ডভাবে ক্ষেপে, অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে থাকে, রীতিমত হত্যার হুমকিও দেয়ে। অমলবাবু মনে খুব কষ্ট পেলেন কিন্তু বহিঃপ্রকাশ করলেন না। ওইচ বোর্ডটা ট্রিক্স খাঁটিয়ে গাড়ির পেছনের বাংকে করে বাসায় নিয়ে আসেন। ইদানিং সুধাংশুর আচার-আচারণগুলো কেমন যেন অমলবাবুকে নৈমিত্তিক ভাবিয়ে তোলে। মাঝরাতে উচ্চস্বরে কথা বলা, সবসময় অন্ধকার রূমে বসে থাকা, সময়মত খাবার না খাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। ছেলেটা আজকাল ঘর থেকেও বের হয়না, ঘাপটি মেরে ঘরে বসে থাকে। কারো সাথে কথাও বলেনা। চোখের নিচে কালো কালো দাগ পড়ে গেছে, নাদুস-নুদুস ফর্সা চেহেরার ছেলেটা ক্রমশ রোগা হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে সন্দেহজনক ব্যাপার হচ্ছে, মাঝরাতে ছেলেটার ঘর থেকে ফিসফিসানির শব্দ পাওয়া যায়। অমলকান্তির সন্দেহ ছেলেটা ইদানিং প্রচুর পরিমাণে ড্রাগ নিচ্ছে। হঠাৎ একদিন কি মনে করে অমলকান্তি উইচ বোর্ডটা নিয়ে বসলেন। 

বৃহদাকার রুম অন্ধকারে আচ্ছন্ন। ভিসিডি প্লেয়ারে মৃদু গম গম শব্দ। চারপাশটা নিঃস্তব্দ। সুধাংশু তার রুমে আটকা অবস্থায় পড়ে আছে। কতটা আর সহ্য করা যায়, তাই অমলকান্তি জেদের বশবর্তী হয়ে দরজা আটকে বসে বসে শখের কাজটা করছেন। অমলকান্তি কিছুটা শূকরের মাংস আর কড়া মদ নিয়ে কাজটা করছেন। এক টুকরা শূকরের মাংসের সাথে এক পেগ মদ অমৃত। উইচ বোর্ডের উপর তিন আঙ্গুল চেঁপে ধরে  কোন ভালো আত্মাকে তিনি ডাকার চেষ্টা করলেন। হঠাৎ সুধাংশুর ঘরে প্রচন্ড দাপাদাপির শব্দ পাওয়া গেল। অমলকান্তি এখন ঘোরের মধ্যে আছেন, কোন শব্দই তার বোধ্যগম্য নয়-মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। শব্দটা ক্রমাগত বাড়ছে একসময় হঠাৎ সব নিশ্চুপ। বাতাসের মৃদু শব্দটাও অমলকান্তি শুনতে পাচ্ছে, তিনি এমন আচানক নিঃশব্দে ভড়কে গেলেন। অমলকান্তি এক পেগ মদ নিলেন বাঁ হাত দিয়ে তারপর ঢক ঢক করে গিলে নিলেন পুরোটা-পুনরায় আবার মনোযোগ দিলেন পুরোনো কাজটায়। বিকট দরজা ভাঙ্গার শব্দে অমলকান্তি হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেলেন। সুধাংশুর রক্তরাঙ্গা দেহ অমলকান্তির সামনে। অমলকান্তি ভয়ে ভয়ে সুধাংশুর শরীর ছুঁয়ে দেখলেন। গায়ের চামড়া ছোলা, শিরা-উপশিরা থেকে রক্তের ফোঁয়াড়া। পশ্চিমা আকাশে খ খ জোঁসনা। কোয়ার্টেজের জানালা ভেদ করে মেঝেতে পড়ছে। অমলকান্তি দক্ষিণের দেওয়ালে এক নারী ছায়ামূর্তি দেখতে পেলেন, অবিকল তার স্ত্রীর ন্যায়। অমলকান্তি তার অত্যাচারের পুরোনো দিনগুলো ধীর গতিতে দেখতে লাগলো। সময় যেন থেমে আছে। ঘরের সুগন্ধীযুক্ত মোমের শেষ আলোটাও নিভে গেল। প্রচন্ড আর্তচিৎকারে অমলকান্তির নিথর দেহটা মেঝেতে পড়ে রইলো। রাতের আঁধারে অমলকান্তির ঘর থেকে এক কালো বেড়াল বের হয়ে গেল। ঘরের সবগুলো পুতুলগুলো যেন এসময় জীবন্ত হয়ে উঠলো। আপনার ঘরের পুতুলটা কি সত্যিই পুতুল  !

(সমাপ্ত)

SHARE

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.