https://banglagolpokobita.com/wp-content/uploads/2018/06/fhu.jpg

আব্দুল ভয়ে সিটিয়ে আছে। আব্দুলের যখন মাত্র ৬ বছর বয়স তখন ও এখন বাসায় এসেছিল কাজ করতে। এখন বয়স ১২। সম্ভবত আজ আব্দুলকে এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। কিন্তু ওর দোষ টা কি সেটা এখনও জানানো হয়নি ওকে।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। আব্দুল যে বাড়িতে কাজ করে সে বাড়ির মালিক, মানুষজন খারাপ ছিল না। এই বাড়িতে আব্দুল সংসারের টুকিটাকি কাজে ওর বড় আপা অর্থাৎ কর্ত্রীকে সাহায্য করে। এই বাসন মাজা, ঘর ঝাড় দেয়া, কাপড় কাঁচা এইসব আরকি।

বাড়ির মানুষজন ওর সাথে তেমন খারাপ ব্যবহারও করেনি তেমন। ছোট খাটো ধমক পর্যন্ত। তবে একবার থাপ্পড় খেয়েছিল বড় ভাইজানের কাছে। সেটা পরীক্ষায় খারাপ করার জন্য। হ্যাঁ, আব্দুল স্কুলে পড়ে। এই বাড়ির বড় ভাইজান ও আসার প্রায় সাথে সাথেও স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। অন্যরা আপত্তি তুলতে জোর গলায় বড় ভাইজান অন্যদের বলেছিল, “অন্যের বাসায় সারাজীবন ঘরমোছা আর বাসন মাজা একজন মানুষের সারাজীবনের ভবিতব্য হতে পারে না”।

একটা এতিম খানা থেকে আব্দুল এসেছিল এই বাড়িতে বেগার খাটতে। কুঁড়িয়ে পাওয়া জীবনকে মানুষ করে গড়ে তোলার দায় আজকাল কে নেয়? কেউ না। তবু এই বাড়ির বড় ভাইজান নিয়েছিল। কে জানে লোকটার মাথায় সমস্যা হয়তো। প্রতিবেশীরা এই নিয়ে বলাবলিও করে।

আব্দুলও বোঝে এই পরিবারের তার ভালোবাসা। তাই একটা কাজের কথা ওকে একবারের বেশি দুবার বলতে হয়না। ও নিজে থেকেও অনেক কাজ এগিয়ে রাখে।

ঠিক এইভাবেই সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু আজ কি হলো কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না আব্দুল। তাঁর অজান্তে কি এমন হয়ে গেছে যে আজ বাড়িতে কোন কাজই তাকে করতে দেয়া হচ্ছে না, করতে গেলেই বাজে ভাবে ধমক দেয়া হচ্ছে। এত ধমক এই ছয় বছরের খায়নি ও। এমনকি ওকে ওর ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। বের হতে চাইলেও ধমক খেতে হচ্ছে। কিছু জিজ্ঞেস করলেও কেউ উত্তর দিচ্ছে না। সবার মুখ কেমন ভার ভার। সাহস করে জিজ্ঞেসাও করতে পারছে না কি ওর অপরাধ।

বেচারা আব্দুল। কতই বা বয়স। ওকে বের করে দেওয়া হবে। তাড়িয়ে দেওয়া হবে। জীবনে প্রথম একটা পরিবার পেয়েছিল, ভালোবাসা পেয়েছিল। মালিকের ছায়ায় পেয়ে গেছিল মা-বাবা। সকাল থেকে এই কথাগুলো, এই কষ্টগুলো পেটের মধ্যে দলা পাকিয়ে সময়ের সাথে সাথে গলার কাছে টোকা দিল। গলার ঢোক গুলো হয়ে উঠলো ভারী।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হয়তো আজ রাতটুকু রেখে কাল দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব। অন্তত তাড়িয়ে দেবার আগে অপরাধটুকু কি ওরা বলবে?

হঠাৎ বড় ভাইজন ধমকে ডাক দিলেন, “এই আব্দুল! এই হতচ্ছাড়া!! উপরে আয়”। আব্দুল কেঁপে উঠলো। ধীরে ধীরে সিঁড়ির পাশের ঘর থেকে বের হলো। তাকাল উপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে। মনে হলো শুধু একটা সিঁড়ি নয় যেন হিমালয় পাড়ি দিতে হবে ওকে।

ধীর এক একটা পদক্ষেপে এগিয়ে চলল সিঁড়ি বেয়ে। মনে হচ্ছিলো খুব ক্লান্ত করে দিচ্ছি ওকে প্রতিটি পদক্ষেপ। এক্ষুনি ওর শরীর ভেঙ্গে পড়বে। ওর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছিল, “বিশ্বাস করেন, বড় ভাইজান আমাকে কিছু করিনি, বিশ্বাস করেন”। কিন্তু বলা হলো না।

অবশেষে ও উপরের ড্রয়ং রুমে পৌছালো। দরজার ধারের সোফায় বড় ভাইজান বসে আছে। ঘর অন্ধকার। একটা বড় ঢোক গিলে ও যখনই ঘরে পা রাখলো সাথে সাথে ঘরে আলো জ্বলে উঠলো। চমকে উঠল আব্দুল।
আর ঘরের অন্যদিক থেকে সবাই চিৎকার করে ফাটিয়ে দিলো, “Happpppppppppy Birthday Abdul.” প্রত্যেকে হাতে র্যা পিং করা ছোট বড় উপহার।

আব্দুল অবাক চোখে দেখলো, ঘরের অন্ধকার পাশে একটা টেবিল ঘিরে সবাই বড়সড় একটা কেক নিয়ে হ্যাপী বার্থডে বলতে বলতে ঘরে কম্পন ধরিয়ে দিচ্ছে। ও নিজেকে প্রশ্ন করলো, এগুলো আমার জন্য? সত্যিই আমার জন্য? আমি না এই বাড়ির কাজের লোক। কাজের লোকের জন্য এমন হয়??
উত্তরটা বড় ভাইজান দিলেন। বড় ভাইজান এইবার সোফা ছেড়ে উঠেলন। আব্দুলের কাঁধে হাত রেখে নিয়ে গেলে। হাতে প্লাস্টিকের ছুঁড়ি আব্দুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “শুভ জন্মদিন আব্দুল। আজ আরেকটু বড় হয়ে গেল। কিন্তু সামনের আরও অনেক অনেক বড় হতে হবে। আমাদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে হবে”।

কষ্টের যে দলাটা সকালে পেট থেকে বিকেলে এসে গলা পর্যন্ত এসে আঁটকে ছিলো। সেটা প্রচণ্ড, তীব্র আর সীমাহীন আনন্দের স্পর্শ পেয়ে ঝড়ে পরলো দু চোখ বেয়ে। কিন্তু সবার উৎসাহ, আর উত্তেজনায় বেচারা আব্দুলের কান্নাগুলো বেশি পাত্তা পেল না।

ওরা সেই কবেই ওদের কাজের লোকটাকে পরিবারের, নিজেদের করে নিয়েছে। ফু দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে উঁচু নিচু, ভৃত্য মালিকের মধ্যে গড়া কাঁটাতার। এইবার সবাই রীতিমত হুমকি ধামকি দিয়ে বললো, “তাড়াতাড়ি ফু লাগা, কেক খেতে আর তর সইছে না”। আব্দুল জোরছে দিল, ফু…।

SHARE

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.